August 2, 2026, 4:30 pm

ড. আমানুর আমান
বাংলাদেশ আজ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে। স্মার্ট বাংলাদেশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব কিংবা টেকসই উন্নয়নের প্রতিটি আলোচনায় গবেষণাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারও উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়া, গবেষণা প্রকাশনা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ঘোষণা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এই উদ্যোগের মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমশ সামনে চলে আসছে—যেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার মূল কেন্দ্র হিসেবে ভাবা হচ্ছে, সেগুলো কি আদৌ সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত?
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে গবেষণা তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা বাড়বে, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন এতে গবেষণার গতি কমবে। কিন্তু বিতর্কটি যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে আড়াল করে দিচ্ছে। প্রশ্নটি কেবল ইউজিসি গবেষণা পরিচালনা করবে কি না, সেটি নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা কতটুকু, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণা কোনো বাজেট ব্যয়ের প্রকল্প নয়; এটি একটি সংস্কৃতি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সফল হতে হলে প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, কার্যকর গবেষণা নীতিমালা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সর্বোপরি গবেষণার নৈতিকতা। অর্থ বরাদ্দ এই ব্যবস্থার একটি অংশমাত্র। ভিত্তি দুর্বল রেখে কেবল অর্থ ঢাললে গবেষণার মান বাড়ে না।
বাংলাদেশে গত দুই দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে এখন দেড় শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু সংখ্যার এই বিস্তার গবেষণার মানে প্রতিফলিত হয়নি। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত গবেষণাসক্ষম শিক্ষক নেই। অনেক বিভাগে এমন শিক্ষক রয়েছেন, যাঁদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনার অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত। কোথাও গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়ার মতো জ্যেষ্ঠ গবেষক নেই, কোথাও আবার গবেষণাগার বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি প্রকট।
একটি সহজ প্রশ্ন করা যেতে পারে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কয়েকশ শিক্ষক থাকেন, অথচ পুরো বছরে সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণাগ্রন্থ, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা নিবন্ধ, পেটেন্ট কিংবা উদ্ভাবন বের না হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা সক্ষমতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে? গবেষণার সাফল্য কেবল বাজেট ব্যয়ে নয়; বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সমাজে বাস্তব প্রভাব তৈরিতে। এই সূচকগুলোয় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এখনো সন্তোষজনক নয়।
এর মধ্যেই সম্প্রতি আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Retraction Watch Database-এর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের গবেষকদের অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার (Retracted) হয়েছে। প্রত্যাহারের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে চৌর্যবৃত্তি (Plagiarism), তথ্য জালিয়াতি, গবেষণা-নীতির লঙ্ঘন, ডুপ্লিকেট প্রকাশনা এবং পিয়ার-রিভিউ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর সঙ্গে দেশের সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্র মানেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জালিয়াত—এমন নয়। একটি গবেষণাপত্রে একজন বা কয়েকজন গবেষকের অনৈতিক আচরণের কারণে সেটি প্রত্যাহার হতে পারে। কিন্তু যখন একই ধরনের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘটতে থাকে, তখন সেটি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং গবেষণা-সংস্কৃতির দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। এটি প্রমাণ করে যে গবেষণার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার নৈতিকতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে আরেকটি প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি গবেষণা প্রকাশের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমে গবেষণার মান ও সততার প্রশ্নটি উপেক্ষা করছি? বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মূল্যায়ন হয় শুধু প্রকাশনার সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং সেই গবেষণার প্রভাব, উদ্ধৃতি (Citation), উদ্ভাবন এবং সমাজে অবদানের মাধ্যমে। অথচ আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো পদোন্নতি বা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংখ্যাগত প্রকাশনাই বড় হয়ে ওঠে। এর ফলে কখনো কখনো গবেষকরা দ্রুত প্রকাশনার চাপ অনুভব করেন, যা অনৈতিক চর্চার ঝুঁকি বাড়ায়।
সরকারের গবেষণা বিনিয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই বিনিয়োগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তব সক্ষমতার ওপর। গবেষণা তহবিল দেওয়ার আগে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অবকাঠামো, শিক্ষকমান, প্রকাশনার ইতিহাস, গবেষণা নৈতিকতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা মূল্যায়ন করা উচিত। সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একই মানদণ্ডে বিচার করা বাস্তবসম্মত নয়। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা বেশি, তারা বড় প্রকল্প পরিচালনা করবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো প্রস্তুত নয়, তাদের জন্য আগে সক্ষমতা উন্নয়নের কর্মসূচি নিতে হবে।
শিক্ষক উন্নয়নের বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন দক্ষ গবেষক রাতারাতি তৈরি হন না। পিএইচডি, পোস্টডক্টরাল গবেষণা, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা, বিদেশি গবেষণাগারে কাজের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মেন্টরশিপের মাধ্যমে একজন গবেষক তৈরি হয়। কিন্তু আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ শিক্ষক নিয়োগের পর গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা খুব সীমিত। ফলে তাঁদের একটি বড় অংশ নিয়মিত গবেষণায় যুক্ত থাকতে পারেন না।
আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও একাডেমিক চাপ। অনেক শিক্ষককে একই সঙ্গে ক্লাস, পরীক্ষা, প্রশাসনিক দায়িত্ব, কমিটি এবং অন্যান্য কাজ সামলাতে হয়। গবেষণার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সময়ের একাগ্রতা, যা এই কাঠামোর মধ্যে অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণায় সক্রিয় শিক্ষকদের জন্য পাঠদানের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে গবেষণা-নৈতিকতা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা জরুরি। গবেষণা পদ্ধতি, তথ্য ব্যবস্থাপনা, প্লেজিয়ারিজম, তথ্য উদ্ধৃতি এবং গবেষণা সততা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ছাড়া মানসম্পন্ন গবেষণা সম্ভব নয়। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন Research Integrity Office বা গবেষণা-নৈতিকতা সেল গঠন করা যেতে পারে, যেখানে গবেষণাপত্র প্রকাশের আগে প্রাথমিক নৈতিক যাচাই হবে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করা সহজ হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাত সহযোগিতাও বাড়াতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে গবেষণার বড় অংশই শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও যদি গবেষণাকে বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে গবেষণার মান যেমন বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনও বৃদ্ধি পাবে।
গবেষণার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে। শুধু কতটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, তা নয়; বরং কতটি গবেষণা নীতিনির্ধারণে ব্যবহৃত হয়েছে, কতটি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সহায়ক হয়েছে, কতটি পেটেন্টে রূপ নিয়েছে এবং কতটি আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ধৃত হয়েছে—এসব সূচককে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানই হওয়া উচিত গবেষণার প্রধান মাপকাঠি।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গবেষণা খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, এটি অবশ্যই স্বাগত। কিন্তু বিনিয়োগের পাশাপাশি গবেষণার ভিত্তি শক্তিশালী করাও সমান জরুরি। দক্ষ শিক্ষক, গবেষণা-নৈতিকতা, আধুনিক অবকাঠামো এবং কার্যকর জবাবদিহি ছাড়া কেবল নতুন তহবিল বা নতুন নীতিমালা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই ইউজিসি গবেষণা তহবিল পরিচালনা করবে কি না, সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি গবেষণানির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়ার জন্য সত্যিই প্রস্তুত? যদি এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অধরাই থেকে যাবে। গবেষণার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু অর্থের ওপর নয়; বরং গবেষণার ভিত্তি, গবেষকের সততা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আগামী পথরেখা নির্ধারণে এই সত্যটি স্বীকার করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ড.আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশকও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস